Activism Lab

অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (৩): কর্মসূচি

এনামুল হোসাইন শাওন
সিরিজঅ্যাক্টিভিস্ট ম্যানুয়াল: অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাপর্ব ৩/৮
  1. •অ্যাক্টিভিস্ট ম্যানুয়াল: অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা
  2. ১.অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (১): পরিকল্পনা
  3. ২.অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (২): সদস্য ম্যানেজমেন্ট
  4. ৩.অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (৩): কর্মসূচি
  5. ৪.অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (৪): রিপোর্টিং ও মিটিং
  6. ৫.অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (৫): পাঠচক্র
  7. ৬.অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (৬): ফান্ড ম্যানেজমেন্ট
  8. ৭.অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (৭): নমুনা ফরম্যাট: রিপোর্ট ও মিটিং
  9. ৮.অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা (৮): নমুনা ফরম্যাট: সদস্য ও পাঠচক্র
তিনটি ছোট মানুষ মিলে রঙিন পাজলের টুকরো জোড়া দিচ্ছে

একনজরে আমাদের কর্মসূচি

আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ইসলামি সোশ্যাল অ্যাক্টিভিজমকে জনপ্রিয় করা, নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য আমাদের প্রধান কর্মসূচিগুলো হলো:

  • ইসলামী সোস্যাল অ্যাক্টিভিজমকে জনপ্রিয় করা: সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্রিয়ভাবে কাজ করা।
  • নিয়মিত অ্যাক্টিভিজম জারি রাখা: ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
  • ব্যক্তিগত আমল ও ইবাদত: কুরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদের সালাত, সিয়াম এবং অন্যান্য নফল ইবাদতকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা।
  • আত্ম-উন্নয়ন: সদস্যদের ব্যক্তিগত ও দক্ষতা বিকাশের জন্য নিয়মিত পাঠচক্র, ওয়ার্কশপ, এবং ট্রেনিং সেশনের আয়োজন করা।
  • জামাতবদ্ধ থাকা: জামাতবদ্ধ বা সংঘবদ্ধ থাকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
  • খেলাধুলা ও বিনোদন: মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা এবং রিক্রুটমেন্টের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষামূলক ভ্রমণের আয়োজন করা।

কর্মসূচীর সময়ভিত্তিক কাঠামো (একনজরে)

প্রাত্যহিক

সাপ্তাহিক

মাসিক

দ্বিমাসিক

ত্রৈমাসিক

ষাণ্মাসিক

জামা'আতে সালাত (ফজর ও ইশা)

হালাকা (সদস্যদের জন্য)

সম্মিলিত রাতের ইবাদত

প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন

সেমিনার/

সেলফ ডেভেলোপমেন্ট ওয়ার্কশপ

সফর/ক্রীড়া প্রতিযোগিতা

দু'আ ও কুরআন তিলাওয়াত

আড্ডাসভা: আড্ডা,চা চক্র, নাশীদ চক্র, খেলাধুলা (একবার)

মাসিক মজলিশ


মসজিদ ভিত্তিক ক্যাম্পেইন



পাঠচক্র (টার্গেটেড অডিয়েন্স)

ক্যাম্পেইন ক্যালেন্ডার অনুসারে ১ টি ক্যাম্পেইন



ষান্মাসিক পরিকল্পনা তৈরি



১টি সমাজসেবামূলক কার্যক্রম






মাসিক কাজের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন সভা






ফান্ডরাইজিং টার্গেট সেট ও কার্যক্রম




বিস্তারিত কর্মসূচী

ক) দৈনিক কর্মসূচী

প্রতিদিনের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক আমল যা আমাদের ভিত্তি সুদৃঢ় করবে।

  • জামাতে সালাত: ইউনিটের সকলে মিলে অন্তত ফজর ও ইশার সালাত জামাতের সাথে আদায় করা।
  • কুরআন তিলাওয়াত: প্রতিদিন কমপক্ষে এক পৃষ্ঠা অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করা।
  • ইস্তেগফার: দৈনিক ১০০ বার ইস্তেগফার পাঠ করা।
  • সকাল-সন্ধ্যার দু'আ: মাসনুন দু'আ ও ২৩ আযকার পাঠ করা।
  • মুনাজাত: হাত তুলে একান্তে কমপক্ষে ৫ মিনিট আল্লাহ্‌র কাছে দু'আ করা।

খ) সাপ্তাহিক কর্মসূচী

সপ্তাহের কার্যক্রমগুলো পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং কাজের গতিশীলতা নিশ্চিত করবে ইনশা আল্লাহ।

নিয়মিত মিটিং ও আড্ডা

  • আড্ডাসভা: সদস্যদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির জন্য চা-চক্র, নাশীদ চক্র, আড্ডা এবং খেলাধুলার আয়োজন করা। এই অনুষ্ঠানে টার্গেটেড অডিয়েন্স, মুয়াফিক, মুনতাসিব ও অ্যাক্টিভিস্টদের যুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।
  • সাপ্তাহিক মিটিং:
    • বিগত সপ্তাহের কাজের পর্যালোচনা ও ফলোআপ।
    • আগামী সপ্তাহের কাজের পরিকল্পনা ও দায়িত্ব বন্টন।
    • সদস্যদের ব্যক্তিগত রিপোর্টের ফলোআপ।
  • জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি
  • পাঠচক্র/হালাকা: সদস্যদের ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য ১টি সংক্ষিপ্ত হালাকা/পাঠচক্র/ট্রেনিং সেশন করা। এর বিষয়বস্তু হতে পারে:
    • আকীদা ও মানহাজ
    • তাযকিয়াতুন নফস (আত্মশুদ্ধি)
    • অ্যাক্টিভিজম স্কিল
  • টার্গেটেড অডিয়েন্সের জন্য পাঠচক্র: টার্গেটেড অডিয়েন্সদের নিয়ে একটি পাঠচক্র পরিচালনা করা (যেমন: ষোলো, আকাশের ওপারে আকাশ বই ইত্যাদি নিয়ে পাঠচক্র... … পূর্বে আলোচিত)।
  • ইবাদত ও আত্মিক উন্নয়ন
  • নফল সিয়াম: সপ্তাহে ২টি নফল সিয়াম পালন করা।
  • কুরআন তিলাওয়াত: সপ্তাহে অন্তত ১ বার সূরা বাকারাহ তিলাওয়াত করা।
  • জুমুআর আমল: জুমুআর দিনে সূরা কাহাফ পাঠ করা এবং আসর ও মাগরিবের পর বেশি বেশি দুয়া করা।

সারাংশ: সপ্তাহে ২টি পাঠচক্র/হালাকা, ১টি আড্ডাসভা এবং ১টি টিম মিটিং করা।

গ) মাসিক কর্মসূচী

মাসিক কার্যক্রমগুলো কাজের পরিধি বৃদ্ধি ও সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে ইনশা আল্লাহ ।

সম্মিলিত ইবাদত ও মজলিশ

  • সম্মিলিত রাতের ইবাদত: প্রতি মাসে একবার মসজিদ, বাসা, হলের কোনো রুমে বা সুবিধাজনক স্থানে একত্রিত হয়ে কুরআন মশক, ইসলাহী মজলিশ, দুয়া ও কিয়ামুল লাইল করা।
  • মাসিক মজলিশ: সদস্যদের দক্ষতা ও জ্ঞানের উন্নতির জন্য মাসিক মজলিশের আয়োজন করা। বিষয়বস্তু হতে পারে: আকীদা ও মানহাজ, আত্মশুদ্ধি বা অ্যাক্টিভিজম স্কিল।

ক্যাম্পেইন ও পরিকল্পনা

  • অ্যাক্টিভিজম ক্যাম্পেইন: ক্যাম্পেইন ক্যালেন্ডার অনুসারে প্রতি মাসে ২টি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা। এর মধ্যে ১টি হবে ডাইরেক্ট সার্ভিস বা সমাজসেবামূলক এবং অন্যটি সচেতনতামূলক।
  • ফান্ডরাইজিং: মাসিক ফান্ডরাইজিং-এর টার্গেট নির্ধারণ ও তা অর্জনের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা।
  • মাসিক মিটিং: বিগত মাসের কাজের পর্যালোচনা, আগামী মাসের পরিকল্পনা ও টিম রিপোর্ট তৈরি, সাংগঠনিক সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য একটি মাসিক মিটিং করা।

ঘ) দ্বিমাসিক কর্মসূচী

সমাজের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়াতে ও সদস্যদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরিতে এই কার্যক্রমগুলো সহায়ক হবে ইনশা আল্লাহ ।

  • প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন: ২ মাসে অন্তত একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। যেমন:
    • ক্রীড়া প্রতিযোগিতা: শর্ট পিচ ক্রিকেট, দৌড়, পাঞ্জা লড়াই, মোরগ লড়াই ইত্যাদি।
    • সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানমূলক প্রতিযোগিতা: সীরাত প্রতিযোগিতা, কুইজ, উপস্থিত বক্তৃতা, কবিতা আবৃত্তি, নাশিদ, রচনা লেখা প্রতিযোগিতা বা বিজ্ঞানমেলা।
  • লক্ষ্য:
    • আয়োজনগুলো হবে আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য।
    • কম খরচে ও স্বল্প পরিশ্রমে আয়োজন করা হবে।
    • ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে। (এসব আয়োজন সাধারণ মুসল্লী ও টার্গেটেড অডিয়েন্সদের সাথে সম্পর্ক তৈরিতে খুব কার্যকর)।

ঙ) ত্রৈমাসিক কর্মসূচী

বৃহৎ পরিসরে দক্ষতা বৃদ্ধি ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই কর্মসূচীগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

সেমিনার ও ওয়ার্কশপ

সদস্যদের ধারাবাহিক উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য প্রতি তিন মাসে একবার সেমিনার বা ওয়ার্কশপ আয়োজন করা। বিষয়ভিত্তিক এক্সপার্ট দ্বারা সেশন পরিচালনা করা হবে এবং টপিক অনুসারে সেমিনার/ওয়ার্কশপের পার্টিসিপেন্ট ঠিক করতে হবে । বিষয়বস্তু হতে পারে:

  • মানহাজ, অ্যাক্টিভিজম, টাইম ম্যানেজমেন্ট
  • লিডারশিপ, নেটওয়ার্কিং, কমিউনিকেশন, টিমওয়ার্ক
  • পাবলিক স্পিকিং, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং
  • লাইফ ও টেক স্কিলস
  • জীবনঘনিষ্ঠ সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা (স্ক্রিন আসক্তি, পর্ণ আসক্তি, মাদক, হারাম সম্পর্ক, জিনা-ব্যভিচার, গরভপাত,বৃদ্ধাশ্রম হতাশা, আত্মহত্যা ইত্যাদি)

মসজিদ ভিত্তিক ক্যাম্পেইন

  • মসজিদ ভিত্তিক কার্যক্রম: মক্তব, পথশিশুদের শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, ফজর ক্যাম্পেইন, বইমেলা, রক্তদান, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, কুরআন হিফয, শিক্ষাসামগ্রী ও ত্রাণ বিতরণের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করা।
  • পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন: প্রতি ৩ মাসের জন্য পরিকল্পনা তৈরি এবং ত্রৈমাসিক কাজের টিম রিপোর্ট তৈরি করা।

বিশেষভাবে মনে রাখুন ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সেমিনার/ওয়ার্কশপ বা অন্যান্য কার্যক্রম অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণভাবে আয়োজন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

চ) ষাণ্মাসিক কর্মসূচী

ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করতে, টার্গেটেড অডিয়েন্সদের আকৃষ্ট করতে এবং সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য আমাদের ছয় মাস অন্তর বেশ কিছু বড় আয়োজন করা যেতে পারে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে। পাশাপাশি, এই উদ্যোগগুলোতে শরিয়াহ মেনে চলার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।

১. স্পোর্টস টুর্নামেন্ট

প্রতি ছয় মাস অন্তর আমরা একটি ক্রীড়া টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারি। ক্রিকেট বা ফুটবল হতে পারে সেই টুর্নামেন্টের মূল আকর্ষণ। এতে সদস্যদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় সহায়তা করবে।

  • শরিয়াহ মেনে চলা: খেলাধুলার সময় অবশ্যই ইসলামের নীতিমালা মেনে চলতে হবে। যেমন:
    • পোশাকের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখা।
    • খেলায় কোনো ধরনের জুয়া বা বাজি ধরা যাবে না।
    • সময়মতো নামাজের ব্যবস্থা রাখা।

২. শিক্ষা ও বিনোদনমূলক ট্যুর

শিক্ষামূলক বা বিনোদনমূলক ভ্রমণের মাধ্যমে সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। নতুন জায়গা দেখা ও নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে মন প্রফুল্ল থাকে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

  • শরিয়াহ মেনে চলা: ভ্রমণের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা আবশ্যক। যেমন:
    • অবৈধ বা হারাম কোনো স্থানে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকা।
    • সালাতের জন্য বিরতি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা।
    • ভ্রমণের সময় গান-বাজনার পরিবর্তে শিক্ষামূলক বা ইসলামি আলোচনা/ নাশীদের আয়োজন করা।

এই উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেক কর্মসূচীর পূর্বে একটি টিম গঠন করে দিতে হবে। তাদের কাজ হবে শরিয়াহর নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ আয়োজনটি পরিচালনা করা।

ছ) বাৎসরিক কর্মসূচী

পুরো বছরের কার্যক্রমের মূল্যায়ন ও আগামী বছরের পথচলার রূপরেখা তৈরি।

  • বাৎসরিক রিপোর্ট: সম্পূর্ণ বছরের কাজের একটি সার্বিক রিপোর্ট তৈরি করা।
  • বাৎসরিক মিটিং:
    • পুরো বছরের কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা।
    • সাফল্য ও ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান।
    • আগামী বছরের জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাজেট প্রণয়ন।

এই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত রিপোর্টিং অপরিহার্য । পরবর্তী অংশে আমরা রিপোর্টিংয়ের গুরুত্ব ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।

শেয়ার করুনFacebookWhatsAppMessenger

সম্পর্কিত লেখা