সামাজিক শক্তি অর্জনের কাজসহ সামগ্রিকভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে তরুণদের উৎসাহ উদ্দীপনা ধরে রাখার উপায় (প্রথম পর্ব)

এক.
অনলাইন কেন্দ্রিক বই পড়া, কোর্স, অডিও ভিজুয়াল কাজের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে তরুণরা উৎসাহ ধরে রাখতে পারে না। সামাজিক শক্তি অর্জনের জন্য যে কর্মসূচীর প্রস্তাব করা হচ্ছে- সেগুলোতেও তরুণরা উৎসাহ উদ্দীপনা ধরে রাখতে পারবে কি? এমন প্রশ্ন চলে আসে অনেকেই মনেই। প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে চলুন দেখা যাক তরুণরা কেন উৎসাহ উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে দ্রুত।
তরুণদের বয়সের কারণে হরমোনাল কিছু ব্যাপার-স্যাপার আসে। তাদের মধ্যে অস্থিরতা, নিত্ত নতুন বৈচিত্র্য খুঁজে বেড়ানোর প্রবণতা থাকে। এটা বয়সের ধর্ম। এটাতে আমাদের কোনো হাত নেই। তাদেরও কিছু করার নেই। কিন্তু যে বিষয়সমূহ নিয়ে আমরা কাজ করতে পারব তা হলো-
১। চিরন্তন লড়াই সম্পর্কে আমরা তরুণদের ধারণা দিতে পারিনি। দেখুন, আদম আলাইহিস সালাম সৃষ্টির পর থেকে শয়তানের সাথে বাবা আদমের লড়াই শুরু হলো। হক্ক ও বাতিলের এ লড়াই কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। এ লড়াই শেষ হবে না কখনো। এখন আমাদের মনে ধারণা গেথে বসে যে অমুক সালের মধ্যে ইমাম মাহাদী আসবে, দাজ্জাল আসবে আর আমরা বিশ্বজয় করে ফেলব। হয়ত ২০২৪ সাল বা ২০২৮ সাল। এমন একটা ধারণা আছে। ২০১৩ সালের দিকে কিছু ভাইয়েরা এসব নিয়ে লেখালেখি করতেন। উনারা একদম ধরে ধরে বলতেন ২০১৮ সালে এই হবে ২০২২ সালে দাজ্জাল আসবে এমন। ২০২২ সালে তো দাজ্জাল আসলো না। এখন? ওই ভাইদের দাজ্জাল আর ইমাম মাহদী কেন্দ্রিক যে ফ্যান্টাসিগুলো ছিল সেগুলোর অবস্থা কী হবে?
দাজ্জাল আসবে এই চিন্তাভাবনা করে যারা দ্বীন পালন করা শুরু করেছিল তাদের অনেকেরই অবস্থা খুব একটা সুবিধার না। এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। এই নির্দিষ্ট দিন/বছর কেন্দ্রিক চিন্তা ভাবনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ কে একবার এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ, কিয়ামত কবে হবে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, কিয়ামতের জন্য তোমার প্রস্তুতি কী? অন্য এক হাদীসে আছে কোনো মানুষ মারা গেলেই তার কিয়ামত শুরু হয়। যে কোনো সময় আমরা মারা যেতে পারি ভাই। তো কিয়ামতের জন্য আমাদের প্রস্তুতি কী? ভাই ও বোনেরা, এই বছর/নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা/দিন কেন্দ্রিক পরিকল্পনা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। না হলে দিন এবং দুনিয়া কোনো ক্ষেত্রেই প্রোডাক্টিভ কিছু করা মুশকিল হয়ে পড়বে। সাহাবীরা এমন কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে দ্বীন পালন করেননি। আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হোক। তাঁরা বুঝেছেন হক-বাতিলের লড়াই চিরন্তন। দাজ্জাল আসুক বা না আসুক তাঁদের এই লড়াই চালিয়ে যেতেই হবে।
২। আমাদের তরুণদের অনেকেই নৈরাশ্যবাদে ভোগে। অনেকেই চিন্তা করে আরে এইতো কিছুদিন পরেই অমুক সালে ইমাম মাহদী আসবে, দাজ্জাল হয়ে যাবে, সব ধ্বংস হয়ে যাবে, ব্যাংক কোলাপ্স করবে… এই এক্টিভিজম এই ক্যাম্পেইন এগুলো করে কি লাভ?
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বৃক্ষরোপন সংক্রান্ত একটি হাদীস আছে। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (ﷺ) বলেছেন, যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কিয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করবে।[১]
হাদীসটি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা দরকার। কিয়ামত হয়ে যাচ্ছে। এসময় গাছের চারা রোপন করে লাভ কী? তারপরেও তিনি কেন গাছের চারা রোপন করতে বললেন? আলেমগণ বলেন এই হাদীস থেকে অবস্থা যেমনই হোক না কেন ভালো কাজ করে যাওয়ার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সুযোগ পেলেই আমরা যেন ভালো কাজ করি। তা যতোই ছোটো হোক না কেন। আমাদের অবস্থা যতোই খারাপ হোক না কেন, আমাদের হাতের কাছে থাকা যে কোনো উপাদান দিয়েই বা যেকোনো সুযোগ পাওয়া মাত্রই আমরা যেন তা ব্যবহার করে ভালো কাজ করি।
আর দাজ্জাল আসা, ইমাম মাহদী আসা এগুলো নিয়ে ১ নম্বর পয়েন্টেই আলোচনা করা হলো। ২০১৩ সালে যে তরুণ এই সামনেই দাজ্জাল আসবে, ২০১৮ সালে দাজ্জাল আসবে ভেবে কোনো কিছু না করে বসে ছিল ২০২৩ সালে এসে তার অবস্থার কথা চিন্তা করেন। আপনি ভাবছেন ২০২৪ সালে চুক্তি শেষ হয়ে যাবার পর তুরস্ক খেল দেখাবে। ২০৩০ সালে দাজ্জাল আসবে- এসব ভেবে কিছু করছেন না। যদি না আসে তখন আপনি কী করবেন? সাহাবীরা কি এভাবে কাজ না করে বসে থাকতেন? রাসূলুল্লাহ ﷺ কি আমাদের এই শিক্ষা দিয়ে গেছেন?
মুহাম্মাদ ﷺ ৪০ বছরে নবুওয়্যাত পান। মক্কাতে ১৩ বছর দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এরপর মদীনায় হিজরত করেন। ৬৩ বছর বয়সে উনি আল্লাহর কাছে যান। দীর্ঘ ২৩ বছরের নবুওয়াতি জীবনের একেবারে শেষের দিকে উনি মক্কা বিজয় করেন। ২৩ বছরের প্রায় পুরোটা সময় উনি অপমান, উপহাস, ক্ষুধা, দারিদ্যতা, অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। উনার শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। প্রিয় সাথীদের নিজ হাতে কবরে শুইয়েছেন। নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন।
নূহ আলাইহিস সালাম দীর্ঘ ৯৫০ বছর ধরে দাওয়াতি কাজ করেছেন। অল্প কয়েকজন মানুষ উনার দাওয়াত কবুল করেছেন।
যে পাগড়িওয়ালাদের নিয়ে আজকে তরুণেরা উল্লাস প্রকাশ করছে, কেন বাংলাদেশে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা হচ্ছে না ভেবে আফসোস করছে, অভিযোগের আঙ্গুল তুলছে, তারা প্রায় ৪০ বছরের মতো সংগ্রাম করে, রক্তের পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান অবস্থানে এসেছেন। আর আমরা তাঁদের মতো কুরবানি করেছি? তাঁদের মতো এতো দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়েছি?
না, এর কিছুই করিনি। আমরা এক স্বপ্নের মধ্যে আছি। ভাবি ২/৪ টা ফেইসবুক পোস্ট মেরে, কমেন্টে অমুক ভাইয়ের, অমুক দলের পিন্ডি চটকিয়ে, ১/২ টা বই বের করে, ঝাক্কাস একটা সেমিনার নামিয়ে একবারে দ্বীন কায়েম করে ফেলব। কুইক ফিক্স। কোনো কুরবানি করা লাগবে না। কোনো সময় লাগবে না। কিন্তু বাস্তবতা তো আর এমন না। তাই আমরা কিছুদিন পরেই হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেই। আমরা ভুলে যাই আল্লাহর চিরন্তন সুন্নাহ, দ্বীনের ইতিহাস। আমরা ভুলে যাই অনেক নবী সারাজীবন দাওয়াত দিয়ে গিয়েছেন কিন্তু একজন মানুষও সেই দাওয়াত কবুল করেননি। আমরা ভুলে যাই ইসলামে প্রকৃত বিজয় মানে হাজার হাজার মানুষের ইসলাম গ্রহণ না, বেস্টসেলার বই এর লেখক হওয়া না। ইসলামের বিজয় মানে হলো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দ্বীনের পথে টিকে থাকা, নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকঠাক ভাবে করে যাওয়া। চলবে ইনশা আল্লাহ…
—
[১] বুখারি, আদাবুল মুফরাদ: ৪৭৯; মুসনাদে আহমাদ: ৩/ ১৮৩
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (