কেন ছোটো ছোটো কাজ/ক্যাম্পেইন ধারাবাহিকভাবে জারি রাখতে হবে?

এক.
“আমি তো এর চাইতেও অনেক বেশি করতে পারি”… আমাদের অনেকের মুখে প্রায়ই শোনা যায় এই কথা। আমরা ভাবি, একসাথে অনেকগুলো প্রজেক্ট হাতে নেব, বিশাল কিছু করবো, পুরো দুনিয়া বদলে ফেলব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আমাদের অনেক সময় চূড়ান্ত ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেয়। কারণ, একজন মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে টানা চাপ নিয়ে কাজ করতে পারে না। শরীর, মন, আবেগ—সবকিছুরই একটা সীমা আছে।
এই অবাস্তব লক্ষ্য এবং প্রথম কয়েকদিনের অতিরিক্ত প্রেসারের ফলেই আমরা হঠাৎ করে বার্নআউট হয়ে যাই। কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। হয়ে পড়ি হতাশ, ক্লান্ত, উদ্যোমহীন। তখন মনে হয়, হয়তো আমি কিছুই পারি না। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। সফল হবার প্রথম শর্ত হলো, ছোট টার্গেট নির্ধারণ করা। আপনি যদি শুরুতেই বড় কিছু করতে যান, তাহলে সেই লক্ষ্যটাই হয়ে দাঁড়াবে আপনার জন্য এক বিশাল পাহাড়। কিন্তু যদি অল্প কিছু দিয়ে শুরু করেন, তাহলে সেটি জয় করা সহজ হবে। যখন আপনি সেই ছোট লক্ষ্যটা অর্জন করবেন, তখন আপনার ভেতরে জন্ম নেবে একধরনের তৃপ্তি। এই তৃপ্তিই আপনাকে আরো কাজ করার উৎসাহ দেবে।
এভাবেই ছোট ছোট সফলতা আপনাকে বড় সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই সঠিক পথ হলো ধীরে ধীরে সামনে এগোনো, নিজেকে বোঝা, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ বেছে নেওয়া। মনে রাখুন, পাহাড়ও জয় করা যায় এক এক পা করে ওঠার মাধ্যমেই। অতএব, ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, কাজে লেগে পড়ুন, আর সাফল্যের পথে নিজেকে তৈরি করুন ধীরে ধীরে।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহর কাছে কোন আমল সর্বাধিক প্রিয়? তিনি উত্তর দিলেন, ‘যে আমল সর্বদা করা হয়, চাই তা কম হোক।’ [১]
দুই.
আজকাল অনেক ভাইয়ের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা যায়—শুধুই বড় বড় প্রোগ্রাম করতে চায় তারা। কারণ এতে গ্ল্যামার আছে, মানুষ চমকে ওঠে, , সোশ্যাল মিডিয়ায় হাইপ ওঠে, বাহবা মেলে। কিন্তু শুধু বড় প্রোগ্রামের দিকে ঝুঁকে পড়া একটি ইউনিটের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রথমত, বড় প্রোগ্রাম করতে গেলে প্রয়োজন হয় অনেক টাকা, সময়, জনবল ও শ্রম। নিয়মিত বড় বড় প্রোগ্রাম করতে থাকলে আপনি আর্থিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, এবং আপনার ইউনিটের সদস্যরা মানসিক ও শারীরিকভাবে অবসন্ন হয়ে পড়বে।
অতিরিক্ত চাপের ফলে তারা পড়াশোনা কিংবা অ্যাক্টিভিসমের অন্যান্য কাজের সময় ও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। একসময় তারা বার্নআউটের শিকার হবে। সেই আগের মতো করে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে মাঠে নামতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, যদি আপনি মাঝে মাঝে বিরাট কিছু করেন, কিন্তু মাঝের সময়টাতে কিছু না করেন, তাহলে সদস্যদের সঙ্গে ইউনিটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তারা অলস সময় কাটাবে, হতাশায় ভুগবে, কিংবা অন্য কোথাও যুক্ত হয়ে পড়বে।
বড় প্রোগ্রাম একেবারে বাদ দিতে হবে তা নয়। তবে সেগুলো হতে হবে হিসেব-নিকেশ করে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির মাধ্যমে। তার চেয়েও জরুরি হলো ছোট ছোট কর্মসূচিকে ধারাবাহিক রাখা। ইউনিটের সদস্যদের গঠন, তাদের কাজে যুক্ত রাখা, ইউনিটকে প্রাণবন্ত রাখা এবং নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নিয়মিত ছোট ছোট কার্যক্রমের বিকল্প নেই। যেমন সাপ্তাহিক পাঠচক্র, ওয়ার্কশপ, ক্যাম্পেইন, এলাকায় ছোট আকারে লিফলেট বিতরণ, পোস্টার মারা, ছোট আকারের কোনো প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা করা,এমনকি একসাথে চা খাওয়ার মতো স্বল্প পরিসরের আয়োজনও। বিশেষ করে ইউনিটে যারা নতুন এসেছে, তাদের হাতে কিছু কাজ না দিলে তারা সহজেই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বে। তাই যতো ছোট কাজই হোক না কেন, সবাইকে কোনো না কোনো দায়িত্ব দিন। একটি ইউনিট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ছোট ছোট কাজের গুরুত্ব নিয়ে চমৎকার আলোচনা এসেছে ডগলাস হাইড রচিত ডেডিকেশন এন্ড লিডারশিপ বইয়ে।
গ্ল্যামারের মোহে পড়ে ছোট ছোট উদ্যোগকে ভুলে গেলে চলবে না। বড় কিছু গড়তে হলে প্রয়োজন ছোট ছোট কাজ করার ধৈর্য, নিষ্ঠা ও কৌশল। নিয়মিত ছোট কর্মসূচির মাধ্যমেই গড়ে উঠবে বড় আন্দোলনের ভিত্তি।
তিন.
নিয়মিত অ্যাক্টিভিসম না করার ব্যাপারটি আর একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। অনেক দিন যদি পড়াশোনা, আত্মউন্নয়ন বা অ্যাক্টিভিসম-সংক্রান্ত কোনো কাজ থেকে দূরে থাকেন, হঠাৎ করে আবার শুরু করতে গেলে দেখবেন মন-মস্তিষ্ক যেন কাজ করতে চায় না। অনীহা, অলসতা আর এক ধরনের মানসিক জড়তা তৈরি হয়। বই খুলে বসলেও মন বসে না, কিছুই মাথায় ঢোকে না।অ্যাক্টিভিসমের ছোট ছোট কাজও ভুল হয়। ৫ মিনিটের কাজ করলে গেলেও অনেক সময় লেগে যায়। এই জড়তার পেছনে মূল কারণ হলো—আপনি অনেক দিন এই কাজের ধারায় ছিলেন না। তাই আপনার ভেতরে এক ধরনের ‘স্থবিরতা’ তৈরি হয়েছে। এভাবে দীর্ঘ বিরতি দিয়ে কাজ করলে প্রয়োজনীয় অগ্রগতি,দক্ষতা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কিন্তু আপনি যদি সত্যিই আবার সেই কাজের ধারায় ফিরতে চান, তাহলে শুরুর দিকে একটু কষ্ট করতেই হবে। প্রথম ৫-১০ মিনিট কাজ করতে বিরক্ত লাগবে, ধৈর্য হারাতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু এটা খুবই স্বাভাবিক। তাই হতাশ না হয়ে, ধীরে ধীরে চেষ্টা চালিয়ে যান। প্রতিদিন অল্প অল্প করে সময় দিন—হয়তো দিনে ১০-১৫ মিনিট —তাহলেও কিছুদিন পরেই দেখবেন একধরনের ‘ছন্দ’ বা ‘ফ্লো’ তৈরি হয়েছে। মনোযোগ বাড়ছে, কাজের গতি বাড়ছে, এবং কাজটা আর আগের মতো কষ্টকর লাগছে না। বরং কাজ করতে ভালো লাগছে, প্রশান্তি আসছে। এই ফ্লো বা গতি আসলে আসে ধারাবাহিকতা থেকে।
যে কাজই হোক না কেন— অ্যাক্টিভিসম, পড়াশোনা, কুরআন মুখস্থ, রিসার্চ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা ইউনিটের কোনো দায়িত্ব—প্রথমে গতি ধীর থাকবেই। কিন্তু আপনি যদি হাল না ছেড়ে নিয়মিত চর্চা চালিয়ে যান, তাহলে সেই কাজ এক সময় আপনার অভ্যাসে পরিণত হবে। তখন আর নিজেকে জোর করে বসাতে হবে না, কাজ নিজেই আপনাকে টেনে নেবে।
চার.
মানুষ হিসেবে আমরা চাই দ্রুত ফলাফল। আজ শুরু করলাম, কালই যেনো তার ফল দেখতে পাই। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। বড় কোনো সাফল্য কখনোই এক লাফে আসে না বরং তা আসে অনেকগুলো ছোট ছোট পদক্ষেপের যোগফলে। এই দর্শনটাকে বলে কমপাউন্ড ইফেক্ট।
কমপাউন্ড ইফেক্টের মূল কথা হলো ছোট ছোট কাজ যদি নিয়মিত করা যায়, তাহলে প্রথম দিকে খুব সামান্য পরিবর্তন চোখে পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব হয় বিস্ময়কর। এই সময়টাতে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় ধৈর্য ও ধারাবাহিকতার। উদাহরণ দেওয়া যাক। সিক্সপ্যাক বানানোর উদ্দেশ্যে আপনি জিমে ভর্তি হয়েছেন। এখন আপনি যদি ভাবেন একদিন জিমে গিয়ে ২৪ ঘণ্টা কসরত করলেই সিক্সপ্যাক হয়ে যাবে, তাহলে সেটা হবে মারাত্মক ভুল । বরং আপনাকে প্রতিদিন অল্প অল্প করে জিম করতে হবে, নিয়ম মেনে ডায়েট, রেস্ট, ওয়ার্কআউট চালিয়ে যেতে হবে। শুরুতে হয়তো এক সপ্তাহ পরেও আয়নায় দাঁড়িয়ে কিছুই দেখতে পাবেন না। তখন মনে হতে পারে, এত পরিশ্রম বৃথা যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা একটুও বৃথা যাচ্ছে না। বরং আপনার শরীর প্রতিদিনই ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছে সেই সিক্সপ্যাকের জন্য।
একসময় গিয়ে হঠাৎ করেই ফলাফল চোখে পড়বে। পেশিগুলো আঁকাবাঁকা হচ্ছে, শরীর হয়ে উঠছে শক্তিশালী। ঠিক তখনই আপনি বুঝতে পারবেন এই ফলাফল আসলে আগের প্রতিটি ‘অদৃশ্য’ দিনের পুরস্কার।
আমাদের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ঠিক এভাবেই কমপাউন্ড ইফেক্ট কাজ করে—ইসলামিক সোশ্যাল এক্টিভিজমে, পড়াশোনায়, দাওয়াহ প্রচারে, আত্মগঠনে, এমনকি ব্যক্তিগত উন্নতিতে। সমস্যা হলো, মাঝের সময়টাতে যখন চোখে কিছুই পড়ে না, তখন আমরা হতাশ হয়ে যাই। ভাবি ‘আমি বুঝি বৃথা সময় নষ্ট করছি’। তখনই অনেকেই থেমে যায়, এবং তাই তাদের কখনোই লক্ষ্য ছোঁয়া হয় না।
এই বিষয়টি আরো ভালোভাবে বুঝতে চাইলে পড়ে দেখতে পারেন ড্যারেন হার্ডির বই The Compound Effect (বাংলা অনুবাদও পাওয়া যায়)। এছাড়াও পড়তে পারেন এই লেখাটি। তবে লেখকের সিনেমা দেখার পরামর্শ মানার প্রয়োজন নেই।

সুতরাং মনে রাখুন যা আজ চোখে পড়ে না, তাই কাল বিস্ময়কর হয়ে ধরা দিতে পারে। যদি আপনি ধৈর্য না হারান, থেমে না যান। ছোট ছোট অদৃশ্য পদক্ষেপই একদিন বড় সাফল্যের মুখ দেখায়।
—
[১] বুখারি : ৬৪৬৫
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (